দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে শি-বাইডেনের রন-কৌশল, পুতিন হটলেও শি জটিল চ্যালেঞ্জ !

প্রকাশিত: ১০:৩১ অপরাহ্ণ, মে ২৩, ২০২১ | আপডেট: ১০:৩১:অপরাহ্ণ, মে ২৩, ২০২১

তালেব রানা ।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দ্বন্দ্বের ‘ফ্লাশপয়েন্ট’ দক্ষিণ চীন সাগর। চীন মনে করে, দক্ষিণ চীন সাগর তার সমুদ্র এলাকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাইনান দ্বীপে চীনের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যে সামুদ্রিক ঘাঁটি রয়েছে শুধু সে কারণেই নয়, চীনের বিশাল বৈশ্বিক উন্নয়ন প্রকল্প, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে সিল্ক রোডের সামুদ্রিক পথও এই সাগর এলাকা।

ফলে চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভবিষ্যত্ সাফল্যের জন্য এই দক্ষিণ চীন সাগর নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীন ২০১২ সাল থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপগুলোতে উন্নয়ন ও বসতি তৈরির বড় ধরনের কার্যক্রম চালাচ্ছে। দ্বীপগুলোর প্রশাসনিক কাঠামো উন্নত করেছে। প্যারাসেলের দ্বীপগুলোতে ছোট ছোট জেলে গ্রামগুলোতে আধুনিক আবাসন তৈরি করে দিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক স্কুল, ব্যাংক, হাসপাতাল এবং মোবাইল যোগাযোগের ব্যবস্থা বসিয়েছে। মূল ভূখণ্ড থেকে পর্যটকরা নিয়মিত প্রমোদতরীতে দ্বীপগুলো ভ্রমণে যায়।

উন্নয়নের দ্বিতীয় ধাপে স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ অধিগ্রহণের কাজও চীন এগিয়েছে। এই স্প্র্যাটলির ছোট ছোট প্রবালদ্বীপে গত ছয় বছরে চীন নৌ প্রকৌশল ও সামরিক স্থাপনা গড়ে তুলেছে, যার মধ্যে রয়েছে বিমান অবতরণ ক্ষেত্র, নৌবাহিনীর রসদের মজুত ও বিমান ঘাঁটি, গোলবারুদের বাংকার, রেডার ক্ষেত্র এবং ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপক সরঞ্জাম। যদিও চীন ছাড়া ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনসহ আরো কয়েকটি দেশ এসব দ্বীপের মালিকানা দাবি করে। এসব দ্বীপের উন্নয়নে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ থেকে এটা স্পষ্ট যে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এই সমুদ্র এলাকায় চীন তার মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য পরিকল্পিতভাবে এগিয়েছে। সেখান থেকে ফেরা চীনের জন্য এখন এক রকম অসম্ভব।

এই অবস্থায় প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ এই এলাকায় নোঙর করছে। যে কারণে প্রায়ই উত্তেজনা বাড়ছে। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে চীনের এই নতুন দ্বীপগুলোকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র রাখে। কিন্তু তার অর্থ হবে চীনের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো, যেটা চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র কারোর জন্যই বাঞ্ছনীয় হবে না। গত বৃহস্পতিবার বেইজিং অভিযোগ করে যে, দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের জলসীমায় অবৈধভাবে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ প্রবেশ করে। পরে ধাওয়া করে সেটিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি এর মধ্য দিয়ে চীনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসন বলছে, আন্তর্জাতিক ঐ সমুদ্র পথের স্বাধীনতা রক্ষায় তারা সব সময় সচেষ্ট থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের আগের প্রশাসন অর্থাত্ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে অবনতি হয়। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের প্রভাব ঠেকাতে তত্পর ছিল ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারে পরিবর্তন হলেও দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে নীতির পরিবর্তন হয়নি।

সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, দক্ষিণ চীন সাগরের ধীর সামরিক উত্তেজনা প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জন্য এক বড় পরীক্ষা। এতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়ার সেনা মোতায়েন আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকৃষ্ট করেছে। যদিও সেনা প্রত্যাহার করেছে রাশিয়া। কিন্তু তাইওয়ান প্রণালিতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা খুব বেশি নজরে আসছে না। রাশিয়া ও চীন বাইডেন প্রশাসনকে শুরু থেকেই পরীক্ষা করছে। পার্থক্য হলো রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যা করছেন তার অনেকটাই দেখানোর জন্য হতে পারে। কিন্তু চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পূর্ব এশিয়ায় প্রভাব বাড়ানোর কৌশল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন আর তাইওয়ানকে আত্মসমর্পণে চাপ দিচ্ছেন। গত এপ্রিলেই তাইওয়ানের কাছে বড় মহড়া চালিয়েছে চীনা বিমানবাহিনী।

কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, অদূর ভবিষ্যতে তাইওয়ানের বিরুদ্ধে অথবা দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক অভিযান চালাবে চীন। বাইডেন প্রশাসন চীনের উসকানিকে অগ্রাহ্য করছে না। ইতিমধ্যে তাইয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করেছে। বাইডেন প্রশাসন তাইওয়ানের অখণ্ডতা রক্ষার প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ দক্ষিণ চীন সাগরে নিয়মিত টহল দিচ্ছে। ঐ অঞ্চলে অংশীদারদের একত্রিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপে চীনের ধীর উত্তেজনা কমবে বলে মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল তাতে পুতিন পিছু হটেন। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে তা হবে না! কারণ শি জিনপিং অনেক বেশি জটিল এক চ্যালেঞ্জ।