‘মওদুদকে এড়িয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির দাবাখেলা বোঝা সম্ভব নয়’ ।। আলী রিয়াজ

প্রকাশিত: ৭:৫২ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৭, ২০২১ | আপডেট: ৭:৫২:পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৭, ২০২১

১৭ মার্চ ২০২১  |সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশের প্রবীণ আইনজ্ঞ রাজনীতিক ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মৃত্যু অনেককেই নাড়া দিয়েছে। রাজনীতিক মওদুদের সমালোচনা থাকলেও তার মেধা, যোগ্যতা ও প্রাজ্ঞতার প্রশংসা সর্বজনীন। তার লেখালেখির প্রশংসা বিরোধী রাজনৈতিক দলের বড় বড় নেতারাও করে থাকেন। দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মওদুদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলছেন, মওদুদ দেশের রাজনীতিতে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ব্যারিস্টার মওদুদের লেখালেখি ও চিন্তার প্রশংসা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিয়ন স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. আলী রিয়াজ। মঙ্গলবার মওদুদের মৃত্যুর খবর পেয়ে মধ্যরাতে বাংলাদেশি এই অধ্যাপক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট লিখেছেন।  তিনি লিখেছেন— আইনজীবী হিসেবে মওদুদের সঙ্গে যারা কাজ করেছেন, এমনকি যারা তাকে রাজনীতির কারণে সমালোচনা করেছেন, তারাও এ কথা বলেছেন যে, তার কাছে আইনের, যুক্তির অনেক কিছু শেখার আছে।  মওদুদকে এড়িয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির দাবাখেলা বোঝা সম্ভব নয় বলেও মত আলী রিয়াজের।

আলী রিয়াজের দীর্ঘ স্ট্যাটাস পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো
‘মওদুদ আহমদের জীবনাবসান হলেও তিনি অনেক দিন স্মরিত হবেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার অবস্থান ও জীবন বর্ণাঢ্য বললেও কম বলা হয়। এক অর্থে বৈপরীত্যে ভরপুরও। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২১ সাল পর্যন্ত তার রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হওয়াই স্বাভাবিক। ১৯৭৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রেই অবস্থান করেছেন, হয় সরকারে কিংবা প্রধান বিরোধী দলের নীতিনির্ধারণে। শাসনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল ওতপ্রোত। ফলে তার নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক না হওয়াই হচ্ছে অস্বাভাবিক। রাজনীতিতে তিনি অকিঞ্চিৎকর ছিলেন না যে, তাকে এড়িয়ে গিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির দাবাখেলা বোঝা সম্ভব হবে। সেই খেলায় সবাই তার সঙ্গে একমত হবেন এমনও আশা করা যায় না। এমনকি তার সমগ্র রাজনৈতিক জীবন নিয়েও আমার/আপনার ভিন্নমত, আপত্তি এবং বিরোধিতা থাকতে পারে। ‘

আইনজীবী মওদুদের প্রশংসা করে আলী রিয়াজ আরও লিখেছেন— মওদুদ আহমদ কেবল রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন আইনজীবী। সেটিই তার কর্মজীবনের প্রথম পরিচয়। যারা ইতিহাসের দিকে তাকান, তারা জানেন যে, ১৯৬৯ সালে কথিত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়’অভিযুক্তদের পক্ষে যেসব আইনজীবী ছিলেন তিনি তাদের একজন। পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত চেষ্টার ফসল ছিল এ মামলা। তিনি তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ছিলেন। স্মরণ করা যেতে পারে যে, স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি নাগরিকদের অধিকারের পক্ষে আদালতে দাঁড়িয়ে ছিলেন– রক্ষীবাহিনীর হাতে আটক অরুণা সেনের হয়ে তিনি মামলা লড়েছেন। আইনজীবী হিসেবে তার সঙ্গে যারা কাজ করেছেন– এমনকি যারা তাকে রাজনীতির কারণে সমালোচনা করেছেন, তারাও এ কথা বলেছেন যে, তার কাছে আইনের, যুক্তির অনেক কিছু শেখার আছে। আইনজীবী হিসেবে তিনি যাদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তাদের সবার ব্যাপারেই আপনি-আমি একমত হব তা নয়। সেই জন্য তার যে সমালোচনা প্রাপ্য সেটি জীবদ্দশায় যেমন জীবনাবসানের পরেও তিনি তা পাবেন। কিন্তু আদালতের প্রাঙ্গণে তার অনুপস্থিতি যে অনুভূত হবে, সেটি তার প্রতিদ্বন্দ্বীরাও অকুণ্ঠ চিত্তে স্বীকার করেন।  এসব নিশ্চয়ই অনেক অনেক দিন আলোচিত হবে।’

আলী রিয়াজের স্ট্যাটাস। ফেসবুক থেকে নেওয়া।

মওদুদের লেখালেখির প্রশংসা করে এই অধ্যাপক বলেন, ‘যে কারণে মওদুদ আহমদ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবেন, তা হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতির বিষয়ে তার গবেষণালব্ধ বইগুলো। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পাঠ এবং বোঝার জন্য আমাদের পড়তে হবে  ‘বাংলাদেশ– কনস্টিটিউশনাল কোয়েস্ট ফর অটনোমি ১৯৫০-১৯৭১ (প্রকাশকাল– ১৯৭৮); ‘এরা অব শেখ মুজিব’ (প্রকাশকাল – ১৯৮৪; বাংলা ভাষ্য ‘শেখ মুজিবের শাসনকাল’); ডেমোক্রেসি অ্যান্ড দ্য চ্যালেঞ্জ অব ডেভেলপমেন্ট (প্রকাশকাল ১৯৯৬); বাংলাদেশ – এ স্টাডি অব ডেমোক্র্যাটিক রেজিম (প্রকাশকাল -২০১২); বাংলাদেশ – ইমারজেন্সি অ্যান্ড আফটারম্যাথ ২০০৭-২০০৮ (প্রকাশকাল ২০১৪)। এসব আমাদের পাঠের দরকার হয় এই কারণে যে, মওদুদ আহমদ এসব গ্রন্থে একাডেমিক – রাজনীতিবিদ নন। তার বিশ্লেষণ নৈর্ব্যক্তিক। যে কোনো একাডেমিক আলোচনার ক্ষেত্রে যা হয় এ ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি; বিতর্কের সুযোগ আছে। কিন্ত এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, এগুলোতে একাডেমিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব আছে। আমার জানামতে বাংলাদেশের রাজনীতি বিষয়ে তার অন্তত পাঁচটি বই আছে যেগুলোতে ১৯৫০ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ের রাজনীতির ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। বাংলাদেশের আরও কোনো রাজনিতিবিদ এতটা নিষ্ঠার সঙ্গে এবং এতটা নৈর্ব্যক্তিকভাবে রাজনীতির বিশ্লেষণ করেছেন কিনা সেটা আমার জানা নেই। তার মৃত্যুতে এ ক্ষেত্রে একটা বড় ক্ষতি হলো।’

প্রসঙ্গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে সিঙ্গাপুর মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমান উপমহাদেশের বিখ্যাত আইনজীবী মওদুদ।

মওদুদ আহমদের একান্ত সহকারী মোমিনুর রহমান সুজন জানান, মওদুদ হাসপাতালে আইসিইউতে ছিলেন। কয়েক দিন ধরেই তার অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল।  ফুসফুসে পানি জমে ছিল। যার কারণে ফুসফুসে অক্সিজেন গ্রহণ ক্ষমতা একেবারেই  কমে গিয়েছিল। পাশাপাশি তার কিডনি জটিলতাও দেখা দিয়েছিল।

রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ হ্রাস, বুকে ব্যথা অনুভব করলে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর মওদুদকে ঢাকায় এভার কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার হার্টে ব্লক ধরা পড়ায় হৃদযন্ত্রে স্থায়ী পেসমেকার বসানো হয়। চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি সিসিইউ থেকে তাকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়। ২০ জানুয়ারি হাসপাতাল থেকে বাসায় নেওয়া হয়। এর পর ২১ জানুয়ারি তাকে আবারও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ২ ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুর যান। মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে তার স্ত্রী হাসনা জসীমউদদীন ছিলেন।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ১৯৪০ সালের ২৪ মে নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শ্বশুর পল্লীকবি জসীমউদদীন। স্ত্রী হাসনা জসীমউদদীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও সাবেক এমপি। ব্যারিস্টার মওদুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করে লন্ডনস্থ লিঙ্কন্স ইন থেকে বার অ্যাট ল ডিগ্রি অর্জন করেন।

লন্ডনে পড়াশোনা করে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন। তিনি ব্র্যান্ড ভিজিটিং প্রফেসর হিসাবে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের আপ্যায়ন সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলাফত রব্বানীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রশক্তির নেতা ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দিয়ে পুলিশি নির্যাতনের পর ঠাঁই হয়েছিল কারাগারে।

১৯৭১-এ ইয়াহিয়া খান আহূত গোলটেবিল বৈঠকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ। পেশাজীবী হিসাবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর আইনজীবী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, মানবাধিকার আইনজীবী হিসাবে নানা ভূমিকায় নিজেকে রেখেছিলেন রাজনীতির কক্ষপথেই।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৭-৭৯ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৭৯ সালে তিনি প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং তাকে উপপ্রধানমন্ত্রী করা হয়। ১৯৮৫ সালের নির্বাচনে মওদুদ আহমদ আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং সরকারের তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

এক বছর পর ১৯৮৬ সালে তাকে আবার উপপ্রধানমন্ত্রী করা হয়। ১৯৮৮ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৮৯ সালে তাকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং এর পর তাকে উপরাষ্ট্রপতি করা হয়।

জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে ১৯৯১ সালে মওদুদ আহমদ আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ২০০১ সালেও তিনি বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পাঁচবার মওদুদ আহমদ নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ আসন থেকে নির্বাচিত হন।